সকালে খেয়ে এসেছো বাবা?”
খুব সাধারণ একটি প্রশ্ন। অথচ এই ছোট্ট প্রশ্নের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে একজন শিক্ষকের অসীম মমতা। শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের বাইরে একজন শিক্ষক যে শিক্ষার্থীর খোঁজ রাখেন, তার ভালো-মন্দ নিয়ে ভাবেন, এই সম্পর্কের গভীরতা হয়তো এমন কিছু ছোট ছোট মুহূর্তেই সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পায়।
শিক্ষক শুধু বইয়ের পাঠ শেখান না, জীবনের পথও দেখান। অক্ষর পরিচয়ের মধ্য দিয়ে যে শিক্ষাযাত্রার শুরু, সময়ের সঙ্গে সেই যাত্রাকে সঠিক পথে এগিয়ে নিতে নীরবে ভূমিকা রাখেন শিক্ষকেরা। ভুল-শুদ্ধের পার্থক্য বোঝানো থেকে শুরু করে কঠিন সময়ে সাহস জোগানো, জীবনের নানা বাঁকে কোনো না কোনোভাবে একজন শিক্ষক হয়ে ওঠেন আমাদের পথপ্রদর্শক।
একজন শিক্ষকের হাত ধরেই শিক্ষার্থীর মধ্যে গড়ে ওঠে স্বপ্ন দেখার সাহস। কেউ ভবিষ্যতে চিকিৎসক, কেউ প্রকৌশলী, কেউ শিক্ষক, গবেষক কিংবা রাষ্ট্রনেতা হওয়ার স্বপ্ন দেখে। সেই স্বপ্নের বীজ বপন করেন শিক্ষকেরাই। তাই শিক্ষকতা কেবল একটি পেশা নয়, এটি মানুষ গড়ে তোলার এক দীর্ঘ দায়িত্ব।
শিক্ষকের এই অবদানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতেই পালিত হয় শিক্ষক দিবস। দিনটি শুধু শিক্ষকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উপলক্ষ নয়, বরং একজন মানুষের জীবনে শিক্ষকের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবকে স্মরণ করারও দিন। কারণ, শ্রেণিকক্ষের পাঠ একসময় শেষ হয়ে যায়, কিন্তু শিক্ষকের দেওয়া শিক্ষা থেকে যায় সারাজীবন।
স্কুলের পুরোনো ক্লাসরুম, ব্ল্যাকবোর্ডে চকের আঁচড় কিংবা পরীক্ষার আগের ব্যস্ত দিনগুলো মনে পড়লে আজও শৈশবের সেই সময়টুকু চোখের সামনে ভেসে ওঠে। বই-খাতা আর পরীক্ষার গণ্ডির বাইরে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের মধ্যে যে মায়া তৈরি হয়, তা সময়ের সঙ্গে সহজে মুছে যায় না।
স্কুলের প্রথম দিনে মায়ের হাত ছেড়ে অচেনা পরিবেশে দাঁড়িয়ে থাকা শিশুটির মাথায় যখন শিক্ষক হাত রেখে বলেন, “ভয় নেই, আমি আছি” তখনই হয়তো অচেনা জায়গাটি একটু একটু করে আপন হয়ে ওঠে। ভুল করলে কখনো শাসন, আবার পরক্ষণেই কাছে ডেকে স্নেহ করা, শিক্ষকের এই কঠোরতা ও মমতার মিশেলই ধীরে ধীরে একজন শিক্ষার্থীকে পরিণত করে।
কৈশোরে প্রিয় শিক্ষকের একটি কথাই কখনো কখনো বদলে দিতে পারে আত্মবিশ্বাসের পুরো গল্প। “তুই পারবি” এই সামান্য কয়েকটি শব্দই হয়তো কোনো শিক্ষার্থীর কাছে হয়ে ওঠে এগিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে বড় সাহস।
তবে গল্পের সবচেয়ে করুণ মুহূর্তটি আসে বিদায়বেলায়। যে শিক্ষককে হয়তো ক্লাসে একটু ভয় পাওয়া হতো, কখনো কখনো এড়িয়ে চলার চেষ্টাও ছিল, সেই শিক্ষককে বিদায়ের মুহূর্তে সামনে দাঁড়িয়ে বিদায় জানাতে গিয়ে চোখের পানি আটকে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। শিক্ষকের চোখেও তখন থাকে গর্ব, ভালোবাসা আর নিজের হাতে গড়ে ওঠা শিক্ষার্থীদের ছেড়ে দেওয়ার নীরব কষ্ট।
সময়ের সঙ্গে শৈশব পেরিয়ে আমরা জীবনের ব্যস্ততায় হারিয়ে যাই। বদলে যায় ক্লাসরুম, বদলে যায় পরিচিত মুখগুলোও। কিন্তু জীবনের কোনো কঠিন মুহূর্তে হঠাৎ মনে পড়ে যায় সেই পুরোনো উপদেশ, সেই সাহস জোগানো কথাগুলো। তখন বুঝতে পারি স্কুল কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ হলেও শিক্ষকের শিক্ষা কখনো শেষ হয় না।
জীবনের পথে আমরা যত দূরেই যাই, আমাদের ভেতরে কোনো না কোনো শিক্ষকের শেখানো কথা থেকে যায়। তাই শিক্ষক শুধু একটি সময়ের সঙ্গী নন, তিনি আমাদের বেড়ে ওঠার নীরব সাক্ষী, স্বপ্ন দেখার অনুপ্রেরণা এবং সারাজীবনের এক পথপ্রদর্শক।
মো: ফয়েজ উদ্দিন