চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ পৌরসভার ১, ২, ৩ নং ওয়ার্ডে 'ভুয়া' কাজী বিবাহ পড়ানোর তথ্য পাওয়া গেছে। ফরিদগঞ্জ পৌরসভার ১, ২, ৩ নং ওয়ার্ডে দীর্ঘ বহু বছর বিয়ে রেজিষ্ট্রেশন করছেন আরিফ নামে এক ব্যক্তি। যার নেই লাইসেন্স এবং নেই বিবাহ রেজিষ্ট্রেশনের কোনো আইনি ভিত্তি।
তবুও আরিফ ফরিদগঞ্জ পৌরসভার উক্ত এলাকায় বছরের পর বছর বিবাহ রেজিষ্ট্রেশন করে যাচ্ছেন। অপরদিকে ফরিদগঞ্জ উপজেলার ৮নং পাইকপাড়া ইউনিয়নের কাজী হিসেবে দাবী করা হারুনর রশিদ কায়ছার নিজেকে ফরিদগঞ্জ পৌরসভার ১, ২, ৩ নং ওয়ার্ডের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কাজী হিসেবে দাবী করছেন।
কিভাবে তিনি অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কাজী ? এই প্রশ্নে হারুনর রশিদ জানান তিনি পৌরসভার ১, ২, ৩ নং ওয়ার্ডের জন্য ১২০ দিনের অতিরিক্ত দায়িত্ব নিয়েছেন। কখন নিয়েছেন ? প্রশ্নে তিনি জানান ২০১৯ সাল থেকে। ১২০ দিনের দায়িত্ব পেয়ে চলমান ২০২৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৭ বছর কিভাবে কাজী হিসেবে বিবাহ রেজিষ্ট্রেশন করছেন ? এমন প্রশ্নে তিনি কোনো সদ্যুত্তর দিতে পারেননি এবং উক্ত ৩টি ওয়ার্ডের বিবাহ রেজিষ্ট্রেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কাজী হিসেবে তিনি বৈধ্য কোন ডকুমেন্টস দেখাতে পারেননি।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে ফরিদগঞ্জ পৌরসভার সচিব আবু সুফিয়ান বলেন ১, ২, ৩ ওয়ার্ডের কাজী কে এই তথ্য তার কাছে নেই। ফরিদগঞ্জ উপজেলা সাব-রেজিস্টার তানভীর আলম জানিয়েছেন ৮ নং ইউনিয়নের কাজী ফরিদগঞ্জ পৌরসভার ৩টি ওয়ার্ডের কাজী হিসেবে দায়িত্ববান হয়েছেন কিংবা ১২০ দিনের দায়িত্ব পেয়ে ৭ বছর দায়িত্বে আছেন এমন যথাযথ ডকুমেন্ট তার কাছে নেই।
আরিফ কিভাবে বিয়ে রেজিষ্ট্রেশনের কাজ করছে ? এই প্রশ্নে ফরিদগঞ্জ সাব-রেজিস্টার তারভীর আলম বলেন- আরিফ হচ্ছে "ভুয়া" কাজী। কেন আপনি তাকে ভুয়া কাজী বলছেন ? এমন প্রশ্নে সাব-রেজিস্টার তানভীর আলম বলেন যার ডকুমেন্টস আমাদের হাতে নেই সে তো ভুয়া কাজীই। এই বিষয়ে ফরিদগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও পৌর প্রশাসক সেটু কুমার বড়ুয়া বলেন-বিষয়টি আমি খোঁজ খবর নিচ্ছি। এবং তিনি জানান কাজীর বিষয়টি সরাসরি আমাদের এখতিয়ারে নয়। এটা চাঁদপুর জেলা রেজিস্ট্রারের এখতিয়ার।
এই ব্যাপারে চাঁদপুর জেলার বর্তমান রেজিস্ট্রার আকবর আলী মৌখিক ভাবে বলেন ফরিদগঞ্জ উপজেলার ৮নং ইউনিয়নের কাজীকে পৌরসভার ১, ২, ৩ নং ওয়ার্ডের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। ১২০ দিনের দায়িত্ব যদি দেয়াও হয় তবে দীর্ঘ ৭ বছর পর্যন্ত কিভাবে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন ? এবং ১২০ দিন পরে হওয়া সকল বিবাহের রেজিস্ট্রেশনের আইনি বৈধতা আছে কিনা ? এবং এসব বিবাহের রেজিষ্ট্রেশন বৈধ্য কিনা ?
এসব প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে তিনি বলেন- ফরিদগঞ্জ পৌরসভা 'ক' শ্রেনীর হিসেবে ৪ জন কাজী নিয়োগের একটি প্রস্তাবনা ফরিদগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও পৌর প্রশাসক সেটু কুমার বড়ুয়া দিয়েছেন। তা মন্ত্রনালয়ে পাঠানো হয়েছে। আইনি সকল প্রক্রিয়া হলে আমরা ফরিদগঞ্জ পৌরসভার জন্য প্রস্তাবিত ৪ জন কাজী নিয়োগ করতে পারবো। চাঁদপুর জেলা রেজিস্ট্রার আলী আকবর আরো জানান মৃত্যুবরণ করা ফরিদগঞ্জ পৌরসভার এমরান কাজীর রেজিষ্ট্রেশন কার্যক্রম বৈধ ছিলনা। ফরিদগঞ্জ পৌরসভার ১, ২, ৩ নং ওয়ার্ডের বিবাহ রেজিষ্ট্রেশন বিষয়ে দীর্ঘ অনুসন্ধানে উঠে আসে আরিফ ও হারুনর রশিদ চক্রের বিবাহ রেজিষ্ট্রেশনের অবৈধ তৎপরতা।
হারুনর রশিদের কাছে জানতে চাইলে হারুন বলেন আরিফ আমার প্রতিনিধি। মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৪ এবং বিধিমালা ২০০৯ এর ২২ ধারার ২ উপধারা এবং ২৮ নং ধারা অনুযায়ী বিবাহে বর এবং কনেকে লাইসেন্সপ্রাপ্ত কাজীর সামনে রেজিষ্ট্রেশন বা কাবিন ফরমে স্বাক্ষর করা বাধ্যতামূলক। কাজী না গিয়ে প্রতিনিধি দিয়ে বিবাহ রেজিষ্ট্রেশন ফরম বা কাবিন ফরম পূরণ করা সম্পূর্ণ অবৈধ ও বেআইনি। এরকম প্রমাণিত হলে কাজীর লাইসেন্স বাতিল করে ঐ কাজীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলার বিধান রয়েছে। কারণ, রেজিষ্ট্রেশনের সরকারি নথি সংরক্ষণের দ্বায় শুধু লাইসেন্সপ্রাপ্ত কাজীর। অন্য কেউ নয়। কিংবা কোন প্রতিনিধির নয়। এক্ষেত্রে তদন্ত করে প্রতিনিধি দাবী করা "ভুয়া" কাজী আরিফ বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবেন কিনা এমন প্রশ্নে চাঁদপুর জেলা রেজিস্ট্রার আকবর আলী বলেন প্রতিনিধি দিয়ে বিবাহ রেজিষ্ট্রেশন করা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং অবৈধ। প্রমাণিত হলে আইন মোতাবেক ব্যবস্থা নেয়া হবে।
মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৪ এবং বিধিমালা ২০০৯ অনুযায়ী, কোনো কাজীর এলাকা শূন্য হলে, কাজীর মৃত্যু হলে বা অনুপস্থিত থাকলে বিধি ৬ (১০) অনুয়ায়ী ১২০ দিনের জন্য পার্শ্ববর্তী এলাকার কোনো কাজীকে অতিরিক্ত বা ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব দেওয়া যায়। ১২০ দিনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর উক্ত আদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে নবায়ন হওয়ার কোনো আইনি সুযোগ নেই। প্রতিবার মেয়াদ বাড়াতে হলে আইন মন্ত্রণালয়ের (আইন ও বিচার বিভাগ) সুস্পষ্ট লিখিত অনুমোদন এবং পুনরায় প্রজ্ঞাপন বা অফিস আদেশ জারি হতে হয়। মুখে মুখে বা আগের আদেশের ধারাবাহিকতায় বছরের পর বছর একই কাজী দায়িত্ব পালন করার আইনগত কোন সুযোগ নেই। ১২০ দিন পর যথাযথ প্রক্রিয়ায় আবারো দায়িত্বপ্রাপ্ত না হয়ে ১২০ দিন শেষ হওয়ার পর বিবাহ রেজিষ্ট্রেশন করলে আইনগত ঐসকল বিবাহের রেজিষ্ট্রেশন প্রশ্নবিদ্ধ হয়। যা পরবর্তীতে ঐসকল বিবাহ রেজিষ্ট্রেশনের বর-কনে পক্ষদ্বয় চরম আইনগত ঝুঁকিতে পড়ার সম্ভাবনা থাকে।
দীর্ঘ অনুসন্ধানে জানা যায় প্রতিনিধি আরিফ কয়েক বছর আগে কাজী নিয়োগ প্রস্তাবনা তালিকায় প্রথম স্থানের প্রার্থী দাবী করে। ঐ নিয়োগ প্রক্রিয়ার তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল তৎকালীন ফরিদগঞ্জ পৌরসভার মেয়র আবুল খায়ের পাটওয়ারী। পরবর্তীতে মেয়রের স্বাক্ষর জালিয়াতি করে ১, ২, ৩ নং ওয়ার্ডের কাজী নিয়োগ চুড়ান্ত করার জালিয়াতি প্রচেষ্টার আগেই ফরিদগঞ্জ পৌরসভার তৎকালীন মেয়র তা টের পেয়ে যায়। তার স্বাক্ষর জালিয়াতির মামলা করেন। পরে স্থগিত হয়ে যায় সেই কাজী নিয়োগ প্রক্রিয়া। স্বাক্ষর জালিয়াতির বিষয়টি জেলা রেজিস্ট্রারকে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন তা তিনি অবগত। এবং কিছু ডকুমেন্টস দেখান।
অন্যদিকে ৮ নং পাইকপাড়া ইউনিয়নের কাজী দাবী করা হারুনর রশিদের কাজীর বৈধতাও নানান কারণে প্রশ্নবিদ্ধ এই বিষয়ে চাঁদপুর জেলা রেজিস্ট্রার আকবর আলী নিরব থেকেছেন। মুসলিম বিবাহ ও তালাক রেজিষ্ট্রেশন আইন ১৯৭৪ এবং বিবাহ ও তালাক রেজিষ্ট্রেশন বিধিমালা ২০০৯ এর ১১ ধারা অনুযায়ী কোন কাজী বিধিমালা লঙ্ঘন করলে তার লাইসেন্স বাতিল এবং তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার বিধান রয়েছে। এই বিষয়ে ফরিদগঞ্জ পৌর নাগরীক ফোরামের সভাপতি মোশাররফ হোসেন নান্নু বলেন- বিধি লঙ্ঘন করে বিবাহ রেজিষ্ট্রেশন বিষয়টি যথাযথ তদন্ত করা হোক। এবং তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য চাঁদপুর জেলা রেজিস্ট্রার এবং আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের বিচার শাখা ৭ এর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
মো: ফয়েজ উদ্দিন